ভর যদি স্থানকালকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে সময়কে ধীর করতে পারে, তবে ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে থাকা সিঙ্গুলারিটি, যা স্থানকালকে অসীমভাবে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়, সেটি কি আসলে সময়কে থামিয়ে দেয়, বা ফ্রীজ করে দেয়?
সিঙ্গুলারিটি হল এমন একটা বিন্দু যেখানে পদার্থবিদ্যার প্রচলিত সমস্ত তত্ত্ব ভেঙে পড়ে। এই বিন্দুটি পাওয়া যায় কৃষ্ণগহ্বরে। বিশাল ভরের একটা নক্ষত্র মৃত্যুর পর তার সমস্ত ভর সংকুচিত হয়ে একটি মাত্র বিন্দুতে ঢুকে পড়ে। সেই বিন্দুটাকেই বলে সিঙ্গুলারিটি। অন্যদিকে আমাদের এই মহাবিশ্বের জন্মও হয়েছে এমন একটি বিন্দু থেকে বিস্ফোরণের মাধ্যমে। আর এসব বিন্দুতে আমাদের প্রচলিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কাজে লাগে না। তাই যদি হয় বিজ্ঞানীদের হাত গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কোন কাজ আছে কি? তাঁরা সিঙ্গুলারিটি তো ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। বিজ্ঞানীরা কোন অসম্ভবকেই ভয় পেয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকেন না। যেখানে প্রচলিত পদার্থবিদ্যার অচল সেই অচলায়তনকে ভেঙে জন্ম দেয়ার চেষ্টা করেন নতুন তত্ত্বের। জন্ম হয় পদার্থবিদ্যার নতুন নতুন সম্যসা। সিঙ্গুলারিটিও বিজ্ঞানীদের ভয় পাইয়ে দিতে পারেনি। হয়ত কিছুটা চমকে দিয়েছিল।
তাই বলে ভাববেন না, বিজ্ঞানীরা সিঙ্গুলারিটির জন্য পদার্থবিদ্যার নতুন কোন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। নতুন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা পায়নি ঠিকই কিন্তু বিজ্ঞানীরা গত ৫০ বছর ধরে সিঙ্গুলারিটিকে ব্যাখ্যা করার নানা রকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে একটা সমস্যা ছিল বৈজ্ঞানিক সমাজে। সমস্যাটা হলো, সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছানোর পরেও কৃষ্ণগহবর কি আসলেই ঘোরে? সিঙ্গুলারিটির আচরণ কি আদর্শ গোলকের মত?
এই প্রশ্নগুলো গত শতাব্দীর ষাটের দশকে কাজ করেছিলেন মার্কিন বিজ্ঞানী জন হুইলার, যাকে আবার আধুনিক কৃষ্ণগহ্বরের জনক বলা হয়। সেই সময়েই কৃষ্ণগহ্বরের রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব ব্রিটিশ গণিতবিদ রজার পেনরোজের। অন্য বিজ্ঞানীদের চেয়ে পেনরোজ একটু ভিন্ন পথে হাঁটলেন। আগের কৃষ্ণগহ্বর গবেষকরা যেভাবে সাধারণ আপেক্ষিকতার সমাধান করে কৃষ্ণগহ্বর ব্যাখ্যার চেষ্টা করছিলেন, পেনরোজ সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এলেন। সাধারণ আপেক্ষিকতার সমাধান করতে তিনি আশ্রয় নিলেন আধুনিক বিশুদ্ধ গণিতের। গণিতের সেই শাখাটি আপেক্ষিকতা সমাধানে এর আগে কেউ ব্যবহার করেননি। পেনরোজ ব্যবহার করলেন টোপোলজি। গণিতের এই শাখাটা ব্যবহার করা হয় কোনো সিস্টেমের সামগ্রিক বিশ্লেষণের জন্য। পেনরোজও স্থান-কালের সামগ্রিক বিশ্লেষণ করলেন টপোলজির সাহায্যে। প্রতিসাম্য-অপ্রতিসাম্যের ঝামেলায় গেলেন না পেনরোজ। অর্থাৎ আদর্শ গোলীয় নক্ষত্রের জন্য সমাধান বের না করে তিনি টপোলজির সাহায্যে স্থান-কালের ব্যাখ্যা করলেন।
তাঁর সমাধান থেকে বেরিয়ে এলো, সূর্যের চেয়ে তিন গুণ বা তাঁর চেয়েও বেশি ভারি নক্ষত্র এক সময় সিঙ্গুলারিটিতে আসবেই। সিঙ্গুলারিটি নিয়ে যতোটুকু দনোমনো ছিল বিজ্ঞানীদের ভেতর, সবটুকুই সাফ হয়ে গেল পেনেরোজের এই গবেষণার পর। তিনি দেখালেন, গোলীয় অবস্থান থেকে বাঁচলেও সিঙ্গুলারিটি এড়াতে পারে না ভারী মৃত নক্ষত্রেরা। পেনরোজের হাতেই জন্ম হল ‘সিঙ্গুলারিটি উপপাদ্য’।
সিঙ্গুলারিটি মানে পদার্থবিদ্যার ব্যর্থতা। অনেক বিজ্ঞানী সেটা নিয়ে অস্বস্তি বোধ করলেন। কিন্তু এটাকে না মেনেও উপায় ছিল না। সেই সময় আরেকটা প্রশ্ন হাজির হয়। সিঙ্গুলারিটির জন্য কি ঘটনা দিগন্ত থাকা অবিশ্যম্ভাবী? তারমানে এমনও তো হতে পারে, মহাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য সিঙ্গুলারিটি, কিন্তু তার বাইরে কোন ঘটনাদিগন্ত নেই?
ঘটনা দিগন্তটা আবার কী? কৃষ্ণগহ্বরে সব ভর জমা হয় সিঙ্গুলারিটি নামের বিন্দুটিতে, কিন্তু এই বিন্দুটায় শেষ কথা নয়। কৃষ্ণগহ্বর তারপাশে প্রবল শক্তির মহাকর্ষ বল ছড়িয়ে রাখে। সেই মহাকর্ষ বলের একটা শক্তিসীমা আছে। সেই সীমার বাইরে থাকা বস্তু কৃষ্ণগহ্বরের প্রবল টান থেকে নিরাপদ। কিন্তু সেই সীমার ভেতরে কোনো বস্তু পড়লে আর রেহায় নেই। প্রবল মহাকর্ষীয় টানে সেটা আছড়ে গিয়ে পড়বে সিঙ্গুলারিটির ভেতরে। সেই যে আকর্ষণ সীমা, সেই সীমাটাকেই বলে ঘটনাদিগন্ত বা ইভেন্ট হরাইজন। সেখান স্থানকাল এমভাবে বেঁকে যায়, ঘটনাদিগন্তের ভেতরে কোনো আলোকরশ্মি ঢুকলেও সেখান থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারে না।
এ প্রশ্নের জবাব দিলেন পেনরোজ। তাঁর হাতেই তৈরি হল ‘মহাজাগতিক নিষেধাজ্ঞা’ নামের আরেকটি নীতি। এই নীতি অনুযায়ী মহাবিশ্বে আবরণ ছাড়া কোন সিঙ্গুলারিটি থাকতে পারবেন না। অর্থাৎ সিঙ্গুলারিটি চারপাশেই অবশ্যই ঘটনা দিগন্তের আবরণ থাকতে হবে। পেনরোজ এই নীতির নাম দিলেন ‘মহাজাগতিক নিষেধাজ্ঞা উপপাদ্য’।
আজকের দিনের সাধারণ আপেক্ষিকতার সকল গবেষণায় পেনরোজের সিঙ্গুলারিটি উপপাদ্য বা মহাজাগতিক নিষেধাজ্ঞা নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিকৃত থেকে গোলকের পথে সমস্যাটা আরেকবার ঝালাই করে নেয়া যাক। পেনরোজের আগে যারাই কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে কাজ করেছেন, সবগুলোতেই কৃষ্ণগহ্বর কে সুষম গোলাক ধরে নিয়েই হিসাব করা হয়েছে। কিন্তু কোনো নক্ষত্রই নিখুঁত গোলাক নয়। নিজ অক্ষকে কেন্দ্র করে যে নক্ষত্র ঘুরবে সে বিকৃত হবে। নক্ষত্রের ভর ও ঘূর্ণনের ওপরে উপরে নির্ভর করবে সে কতটুকু বিকৃত হবে।
নক্ষত্র যে খুব বেশি বিকৃত হয় তা কিন্তু নয়। সুষম গোলাক না হলেও মোটামুটি সে গোলাককার। ভর খুব বেশি হলে তার ভেতরের পদার্থগুলোর পার¯পরিক আকর্ষণ নক্ষত্র গোলাককার হতে বাধ্য করে। শুধু নক্ষত্র বা বলি কেন। গ্রহ উপগ্রহগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা চলে। সে সূর্যই হোক আর আমাদের এই পৃথিবী কিংবা বৃহস্পতির মতো বড় গ্যাসীয় গ্রহ কিংবা শনির মতো বলয়যুক্ত গ্রহই হোক- মোটামুটি সবাই গোলককার।
চাঁদের ভর তত বেশি না হলেও বেশি না হলেও একে মোটামুটি গোলক বলাই চলে। কিন্তু গ্রহাণুগুলো চাঁদের মতো গোলাকার নয়। বৃহ¯পতি আর শনির বেশ কিছু চাঁদ আছে, যেগুলো পাথরের মত। কিছুটা লম্বাটে এবড়ো-খেবড়ো। আসলে এগুলো যখন তৈরি হয় এর ভেতরেভ পদার্থের পরিমাণ খুব কম ছিল।
তাই সেগুলোর মহাকর্ষ বলের টানও বেশ কম ছিল। । দুর্বল মহাকাশের শক্তির ক্ষমতা হয়নি সব পদার্থকে কেন্দ্রের দিকে টেনে নিখঁত গোলকের মত বানাবে। এমন কি মোটামুটি গোলকের মত বানানোর জন্য পর্যাপ্ত মহাকর্ষ আকর্ষণ তার ছিল না। তাই গোলাককার না হয় বিকৃত পাথরের মত হয়েছে।
যেসব গ্রহ নক্ষত্রের মহাকর্ষ টান পর্যাপ্ত সেগুলো নিখুঁত গোলাকার হতে পারত না? আগেই বলেছি, গ্রহ নক্ষত্রের ঘূর্ণন গতিভ কারণেই নিখুঁত গোলাকার হতে পারেনি কেউ। সে যত বেশি ভারী নক্ষত্রই হোক।
তাই যদি হয়, কৃষ্ণগহবরের ক্ষেত্রে হিসাব তো মেলে না। সব কৃষ্ণগহ্বরকে নিখুঁত গোলক হিসেবে ধরেই সমাধান বের করা হয়েছে। তাই ঝামেলা রয়েই গেল। কিন্তু প্রতিটা বিজ্ঞানী যেমন আলাদা মানুষ, তাদের হিসাব-নিকাশ তেমন আলাদা। কিন্তু ওপেনহাইমার, স্নাইডার, হুইলার, পেনরোজের মত বিজ্ঞানীরাও কৃষ্ণগহ্ববর নিখুঁত গোলাককার হবে কি হবে না সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি।
তখন আর একদল বিজ্ঞানী এগিয়ে এলেন। তারা বললেন নক্ষত্র যত বেশি ভারীই হোক আর তুলনামূলক হালকাই হোক, সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর যদি কৃষ্ণগহ্বর তৈরির মত যথেষ্ট ভর থাকে, সেই ভর কেন্দ্রের দিকে সংকোচনের সময় এমন অবস্থায় চলে আসবে, সেটা নিখুঁত গোলকের মত দাঁড়াবে। তো কারা করলেন এই হিসাব? তাদের কথা না একটু পরেই জানলম। তার আগে কৃষ্ণগহবরের আর একটা চরিত্রের কথা জেনে আসি। সেটা হল এর বৈদ্যুতিক আধান। জানি অনেকের মনেই এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। আধানের আমদানী হলো করে? এত বিশাল যার ভর, এত বিরাট যে জিনিস সে কেন চার্জ নিরপেক্ষ নয়? পৃথিবী তো মোটামুটি চার্জ নিরপেক্ষ।
আধান থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আগেই বলেছি সংকোচনের আগেই সমস্ত পদার্থ সমস্ত পরামাণু ভেঙে মৌলিক কণিকায় পরিণত হয়। প্রতিটা মৌলিক কণিকার আধান আছে। সে কোয়ার্ক হোক, আর ইলেকট্রন হোক। এইসব চার্জ কোথায় যাবে?
অনেক বিজ্ঞানীর মাথায় তখন এই ভাবনাটা এল। বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে দেখলেন, একটা সমস্যার সমাধান পাওয়ার আগেই আরেকটা সমস্যা এসে হাজির।
জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল প্রথম আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিতার সমাধন থেকে কৃষ্ণগহ্বরের ধারণা পেয়েছিলেন। তাঁর সমাধানে সমাধানে নক্ষত্র মহা সংকোচন এরপর সব তথ্য বিলীন করে দিত। থাকত শুধু ভর। আধুনিক বিজ্ঞানীরা বললেন, নক্ষত্রের উপাদানগুলোর আধান বৈশিষ্ট্যও রয়ে যাবে। অবশ্য বিজ্ঞানীরা বলেননি, সেই আধানের খবর পর্যবেক্ষকরা এ পাবেন কোনো ডিটেক্টরের মাধ্যমে। তারা বলেছিলেন, আধান বৈশিষ্ট্য কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরেই আটকে থাকবে। সেটা বাইরে বেরিয়ে এসে কৃষ্ণগহবরের ভেতরের খবর জানাতে পারবে না।
মজার ব্যাপার হল কৃষ্ণগহ্বরের আধান জনিত বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীরা গত শতকে ষাটের দশকে মধ্যভাগে জোরেশোরে বলছেন। কিন্তু এ কথাটি অনেক আগেই বলেছিলেন জার্মান বিজ্ঞনী হ্যান্স রাইজনার এবং ফিনিশ বিজ্ঞানী গার্নার নর্ডস্ট্রম। ১৯১৮ সালে কিন্তু তখনকার জ্যোতির্বিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি ওই দুই বিজ্ঞানীর গবেষণা। জন হুইলার সেটাই আবার ফিরিয়ে আনলেন। বললেন, কৃষ্ণগহ্বরে ভেতরেই নক্ষত্রের মাত্র দুটি বৈশিষ্ট্য রয়ে যায়। ভর আর আধান।
অনেকেই তখন প্রশ্ন করেন, এত এত বৈশিষ্ট্য কিভাবে বিলীন হয়?
সমাধানটা চট করে দিতে পারেন না হুইলার। তখন একদল রুশ বিজ্ঞানী এ প্রশ্নের জবাব দিলেন। জেলদোভিচ, দরশকেভিচ আর নভিকভ। তিন বিজ্ঞানী যে সমাধানটা দিলেন সেটাও আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার সমাধান থেকে বেরিয়ে আসে। সেটা হল এ যুগের মহা আবিষ্কার মহাকর্ষ তরঙ্গ। তিন রুশ বিজ্ঞানী বললেন, অন্য সব তথ্য বৈশিষ্ট্য ভারী নক্ষত্র কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হওয়ার আগেই মহাকর্ষ তরঙ্গ রূপে মহাশূন্যে বিলীন করে দেয়। মহাকর্ষ তরঙ্গ নিয়ে তখন একটা হইচই চলছিল। এর আগে একমাত্র যোসেফ ওয়েবার ছাড়া আর কেউই চাইতেন না মহাকর্ষ তরঙ্গের কথা।
মানবেনই না কেন? তখনো পর্যন্তমহাকর্ষ তরঙ্গ শুধু আইনস্টাইন এর সমাধানেই ঘুমিয়ে আছে। বাস্তব প্রমাণ পেতে আরও পঞ্চাশ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে বিজ্ঞানীদের। যোসেফ ওয়েবার ভাওতাবাজি করে সরকারের কোটি কোটি ডলার ব্যায় করে একদিন ঘোষণা করলেন মহাকর্ষ তরঙ্গ শণাক্ত করতে পেরেছেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই ওয়েবারের যোচ্চুরি প্রমাণ হয়। তবে এই ঘটনাই বিজ্ঞানীদের উদবুদ্ধ করল মহাকর্ষ তরঙ্গ শণাক্তের কাজে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একদল বিজ্ঞানী ঘোষণা দিলেন আইনস্টাইনের সমাধান থেকে বেরিয়ে আসা সেই মহাকর্ষ তরঙ্গ ১০০ বছর পর পা দিয়েছে বিজ্ঞানীদের পাতা ফাঁদে। এখন বিজ্ঞানীরা জোর গলায় বলতেই পারেন, মহাকর্ষ তরঙ্গের কথা। কিন্তু ১৯৬৫ সালে সেটা জোর দিয়ে বলার মত লোক ছিল হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র।
সুতরাং কৃষ্ণগহ্বর মহাকর্ষ তরঙ্গ বিকিরণ করে মহাশূন্যে তথ্য বিলীন করে দেয় একথা মানার লোক খুব কম ছিল তখন। ক্যালটেকের বিজ্ঞানী রিচার্ড প্রাইস গাণিতিকভাবে প্রমাণ করলেন, রুশ বিজ্ঞানীদের কথায় ঠিক, মহাকর্ষ তরঙ্গ বিকরণ করে মহাশূন্যে তথ্য বিলীন করে দেয় কৃষ্ণগহ্বর। এজন্যই জন হুইলার সেই তত্ত্বের নাম দিলেন হেয়ারলেস থিওরেম বা চুল হীনতার উপপাদ্য।
জন হুইলারও ছিলেন নিউক্লিয়ার বোমার অন্যতম কারিগর। হুইলার নিউক্লিয়ার বোমা বানানোর অভিজ্ঞতাই কাজে লাগালেন কৃষ্ণগহ্বর গবেষণায়। হুইলার প্রথমেই নিশ্চিত হতে চাইলেন, সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর যে ঘটনা ঘটে, অর্থাৎ ৩ সৌরভর অক্ষুণ থাকলে সেই নক্ষত্রের মহাকর্ষীয় পতন অনিবার্য কিনা।
এজন্য তিনি সাহায্য নিলেন দুই সহকর্মীর- কেন্ট হ্যারিসন আর মাসামি ওয়াকানোর। এই দুই পদার্থবিদেও সহযোগিতায় একটা লিস্ট তৈরি করলেন হুইলার। তালিকটা ছিল নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া বন্ধ হওয়ার পর সম্ভাব্য যত রকম অবস্থায় পাওয়া যেতে পারে নক্ষত্রদের। এই তালিকায় বিভিন্ন ভরের নক্ষত্রদের স্থান দেওয়া হলো। হিসাব কষে দেখানো হলো বিভিন্ন ভরের নক্ষত্র নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া শেষ হবার পরে সেগুলো কী কী পদার্থ থাকে। ভর অনুযায়ী সেসব পদার্থেও ভেতরের কোয়ান্টাম চাপ কেমন হবে, সেই চাপ আদৌ অতিমাত্রার মহাকর্ষীয় চাপ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে কি না।
এই তালিকা ধরে হিসাব কষে নানারকম ভরের নক্ষত্রের শেষ পরিণতি বের করার চেষ্টা করলেন হুইলার। তাঁর সেই গবেষণা থেকে যে ফল বেরিয়ে এলো, সেটা আরো বেশি করে প্রতিষ্ঠিত করল ওপেনহাইমার স্নাইডারের তত্ত্বকে।
তিনি হিসাব কষে দেখলেন, সত্যিই শ্বেত বামন আর নিউট্রন তারা মাঝখানে আর কোনো স্থিতিশীল অবস্থা লাভ করতে পারে না ভারী নক্ষত্র। আরও দেখলেন, সত্যিই নিউট্রন তারার সীমা পেরিয়ে যাওয়া কোনো নক্ষত্র আর কোনো স্থিতিশীল অবস্থায় আসতে পাওে না। তার মানে, চরম মহাকর্ষীয় টান সংকুচিত করে ফেলে গোটা নক্ষত্রকে।
এরপর হুইলার মন দিলেন মহাকর্ষীয় সংকোচনের শেষ পরিণতি কী হবে সেদিকে। নিশ্চিত হলেন সিঙ্গুলারিটিতে শেষ হবে নক্ষত্রের সব পদার্থবৈজ্ঞানিক হিসাব-নিকাষ। কিন্তু হুইলার ছিলেন বড্ডই খুঁতখুঁতে টাইপের। সবকিছুতেই একটা বাড়তি সন্দেহ থাকত তাঁর। সত্যিকারের বিজ্ঞানীদের এই খুঁতখুঁতে স্বভাবই তাদের কাজকে, তত্ত্ব আরও বেশি নিখুঁত করে তোলে। হুইলার এবার এগুলেন নক্ষত্রের ঘূর্ণনের দিকে। ওপেনহাইমার-স্নাইডার নক্ষত্রটিকে সুষম গোলক ধরে হিসাব কষেছিলেন। সেই নক্ষত্রের কোনো ঘুর্ণন ছিল না। হুইলার দেখতে চাইলেন, এই ত্রুটি কীভাবে দূর করা যায়। অর্থাৎ নক্ষত্রেরে ঘূর্ণনও থাকবে আবার সেটা সুষম বা আদর্শ গোলকও থাকবে। সুষম গোলক হলে সেটার ঘূর্ণন থাকা অসম্ভব। আবার সুষম গোলক না হলে আইস্টাইনের সমাধান ধরে এগোনো অসম্ভব। কিন্তু গাণিতিক ফলাফল বলছে ভারি নক্ষত্রের শেষ পরিণতি হবে সুষম গোলকে। আবার সেটা ঘূর্ণনও থাকবে।
এই চিন্তা থেকেই হুইলারের মাথায় এলো এক যুগন্তকারী ভাবনা। অন্য কারো পক্ষে তখন এটা ভাবার সম্ভব ছিলা কিনা সন্দেহ। ভারী নক্ষত্রের মহাকর্ষীয় সংকোচন ব্যাখ্যা করার জন্য হুইলার ব্যবহার করলেন নিউক্লিয়ার বোমার উদাহরণ। আপতদৃষ্টিতে দুটো একদম আলাদা বিষয়। কিন্তু হুইলার সেই দুটো বিষয়কেই একসূত্রে গাঁথতে চাইলেন। নিউক্লিয়ার বোমায় বোমার খোলের ভেতর বিপুল পরিমাণ শক্তি আটকে রাখা হয়। তারপর বিস্ফোরণের সময় হঠাৎ সেই শক্তি মুক্ত হয় এবং ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।
এই বিষয়টাকে যদি উল্টোভাবে দেখা যায়। তাহলে দেখা যাবে প্রথমে চারপাশে ছড়িয়ে পড়া শক্তি সংকুচিত হয়ে বোমা খোলের ভেতর ঢুকে পড়ছে। হুইলার নিউক্লিয়ার বোমায় ছড়িয়ে পড়া শক্তির যেসব গাণিতিক পদ্ধতি ছিল, সেগুলোকেই ব্যবহার করতে চাইলেন কৃষ্ণগহ্বরের তত্ত্বে। তবে উল্টোভাবে। নিউক্লিযার বোমার ভেতর নিউক্লিয়ার ফিশন ঘটে। এতে একটা ভারি নিউক্লিয়াস ভেঙে অনেকগুলো ছোট ছোট নিউক্লিয়াস তৈরি হয়। অন্যদিকে, নক্ষত্রের ভেতর নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় ছোট ছোট নিউক্লিয়ার যুক্ত হয়ে ভারি নিউক্লিয়াস তৈরি করে। অর্থাৎ এখানেও হিসাবটা উল্টো।
নিউক্লিয়ার বোমা তৈরির সময় কম্পিউটারের সাহায্যে কতগুলো হিসাব কষতে হয়েছিল হুইলারের মতো বোমা নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীদের। হিসবাগুলো ছিল, নিউক্লিয়ার বোমায় উৎপন্ন তাপ, তাপের সঞ্চারণ, বিকিরণ, ছিটটে বেরিয়ে আসা পদার্থের পরিমাণ, সেগুলোর গতি ইত্যাদি। এসব হিসাব ঠিকঠাক মতো কষে বোমা বানালেই কেবল সেটা ঠিকঠাক বিস্ফোরণ ঘটাবে। বোমা বানানোর এই উপাদাগুলি, হিসাবগুলি যেভাবে করা হয়েছে, হুইলার বললেন সেই হিসাবটাই উল্টোভাবে ঠিকঠাকমতো করলে ভারী নক্ষত্রের শেষ দশায় কী কী উপদান, কী পরিমাণ বিকিরণ, তাপশক্তি থাকে সেটার হিসাব পাওয়া যেতে পারে।
হুইলারের এই প্রস্তাব মনে ধরে আরেক মার্কিন বিজ্ঞানী ক্যালিফোর্নিয়ার লিভারমোর ল্যাবরেটরির গবেষক স্টারলিং কোলগেটের। কোলগেট তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে হিসাব কষতে বসলেন। কম্পিউটারের সাহায্যে তাঁরা যে হিসাব বের করলেন, তা ২৫ বছর আগে বের করা কৃষ্ণগহ্বরের আদি তত্ত্বের সাথে মিলে যায়। সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর সূর্যের চেয়ে তিনগুণ ভর অবশিষ্ট থাকা নক্ষত্রের ভেতরে যতই নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ঘটুক কিংবা বজায় থাকুক কোয়ান্টাম চাপ, সেটার পক্ষে আর সম্ভব নয় মহকর্ষীয় সংকোচন রুখে দেওয়া।
কোলগেটের এই আবিষ্কার উৎফুল্ল করেছিল হুইলারকে। ভারী নক্ষত্রের শেষ পরিণতি যে কৃষ্ণগহ্বর তার বিপক্ষে যতটুকু সংশয় হুইলারের মনে ছিল, সেটুকুও মুছে গেল। অবশ্য তখনো ভারী নক্ষত্রের শেষ দশার নাম কৃষ্ণগহ্বর হয়নি। তখনো একে ডার্কস্টার বলা হতো। ১৯৬৯ সালে হুইলারই এর নামকরণ করেন ব্ল্যাকহোল। বাংলায় একে কৃষ্ণগহ্বর, কৃষ্ণবিবর ইত্যাদি নামে ডাকা হয়।
১৯৫৮ সালের ঘটনা। তরুণ মার্কিন বিজ্ঞানী ডেভিড ফিংকেলস্টাইন একটা দুই লানেইর অঙ্ক কষে অসাধ্য সাধন করলেন। তিনি দেখালেন, শোয়র্জশিল্ড ব্যাসার্ধ অর্থাৎ ঘটনাদিগন্তেই স্থানকালের বক্রতা অসীম হয় না। তারমানে শোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধই আসল সিঙ্গুলারিটি নয়। শোয়ার্জশিল্ড একটা নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ কাঠামো ব্যবহার করে ঘটনা দিগন্তে সিঙ্গুলারিটি হিসেবে দেখিয়েছিলেন। ফিংকেলস্টাইন আলাদা একটা প্রসঙ্গ কাঠামো ব্যবহার করেছিলেন তাঁর অংকে। তিনি বলেন, ঘটনাদিগন্তে যে সিঙ্গুলারিটি দেখিয়েছিলেন শোয়ার্জশিল্ড, সেটা মোটেও বক্র জ্যামিতির ভুল নয়। ভুলটা বরং করেছিলেন শোয়ার্জশিল্ড নিজে, ভূল প্রসঙ্গ কাঠামো বেছে নিয়ে। তিনি বলেন, ঘটনা দিগন্ত পেরিয়ে গিয়েও নক্ষত্রের গোটা ভর একটা বিন্দুর দিকে সংকুচিত হবে। সেই বিন্দুটাই হচ্ছে আসল সিঙ্গুলারিটি। আরেকবার গাণিতিকভাবে প্রমাণ হলো ঘটনাদিগন্তে গিয়েই নক্ষত্র সংকোচন বন্ধ করে দেয় না। বরং ঘটনা দিগন্ত পেরিয়ে এটা আয়তনশূন্য বিন্দুর দিকেই সংকোচন চলতে থাকে। সত্যিই যদি তখন একজ নপর্যবেক্ষক থাকেন সেই কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনাদিগন্তে।
চাইলেই দিগন্তরেখা পেরিয়ে সহজেই ঢুকে যেতে পারবেন কৃষ্ণগহ্বরের আরো গভীরে। ঘটনাদিগন্তেই যদি স্থানকালের বক্রতা অসীম হতো তাহলে পর্যবেক্ষক জমাট ঘটনা দিগন্ত পেরিয়ে কখোনই ভেতরে ঢুকতে পারতে না। কিন্তু নতুন তত্ত্ব অনুযায়ী নক্ষত্রের সংকোচোনের সাথে সাথে আমাদের পর্যবেক্ষকও ঢুকে যাবেন ঘটনাদিগন্তের আরো গভীরে। তিনি হয়তো একেবারে সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছনোর আগ পর্যন্ত কিছুই বুঝতে পারবেন না এরপর কী হবে।
তবে আমাদের পর্যবেক্ষকের পরিণাম কিন্তু ভালো হবে না। ঘটনাদিগন্ত পেরোনোর সাথে সাথে তার ওপর ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। ধরা যাক, তাঁর পা আছে সিঙ্গুলারিটির দিকে আর মাথা ঘটনাদিগন্তের দিকে। ঘটনাদিগন্তের ভেতরে ভেতর মহাকর্ষ বল এতটাই শক্তিশালী, সামান্য দূরত্বও তখন অনেক বেশি।
পর্যবেক্ষকের পা আর মাথার সাথেও সিঙ্গুলারিটির মহাকর্ষীয় টানের ব্যবধান অনেক। পায়ের দিকের মহাকর্ষ বল বহুগুণে বেশি। তাই পর্যবেক্ষকের মাথা আর পায়ের মধ্যে কোনো ভারসম্য থাকবে না। প্রচ- টানে পর্যবেক্ষক সরু ফিতার মতো পাতলা আর চ্যাপ্টা বস্তুতে পরিণত হবেন। শেষে তাঁর পুরো দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে, এমনকী অণু-পরমাণুতেও অক্ষত থাকতে পারবেন না। মৌলিক কণিকায় পরিণত হয়ে নিক্ষিপ্ত হবেন সিঙ্গুলারিটিতে। এত বড় ঘটনা ঘটে যাবে কিন্তু বাইরের কোনো পর্যবেক্ষক শত চেষ্টা করলেও সেটা দেখতে পারবেন না।
এই অধ্যায় শেষ করা যাকা একটা প্রশ্ন দিয়ে। একটা নক্ষত্রের ঘটনা দিগন্ত থেকে সংকুচিত হয়ে সিঙ্গুরিটিতে মহা মহাতন ঘটতে ঠিক কতটা সময় লাগবে? হিসাব বলে নক্ষত্রের ভর যত বেশি হবে, তার সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছতে তত বেশি সময় লাগবে। সূর্যের তিনগুণ ভরের সাধারণ একটা নক্ষত্রের সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছতে সময় লাগবে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু সূর্যের চেয়ে হাজারগুণ ভারি নক্ষত্রের সময় লেগে যাতে পারে পুরো একটি দিন।
এখন প্রশ্ন হলো এই একটা বিন্দু, ইউক্লিডের সংজ্ঞায় যাকে বলে, আয়তনশূন্য একটা বিন্দু, সেই আয়তনশূন্য বিন্দু এত বিশাল ভরের বস্তু কীভাবে ঠাসাঠাসি করে থাকে। নিউট্রন স্টারের ঘনত্ব এতই বেশি সেখান থেকে এক চামচ মাটি (আক্ষরিক অর্থে মাটি নয়, নিউট্রন স্টারের গাঠনিক উপাদন) তুলে যদি দাড়িপাল্লা মাপা হয়, তার ভর হবে একট কোটি টন! এটা প্রমাণিত। মানতে অসুবিধা নেই। কারণ পরমানুর ভেতরে অনেক ফাঁক থাকে। বলতে গেলে একটা পরমাণুর নিউক্লিয়াস ইলেকট্রন মিলে যে পরিমাণ জায়গা নেয় তা পরমাণুর দশ হাজার ভাগের একভাগ। বাকিটা ফাঁকা বা শূন্য। নিউট্রনস্টারে আস্ত পরমাণু থাকে না। পরমাণু ভেঙে মূল কণিকায় পরিণত হয়। সেসব কণিকা একেবারে গায়ে গায়ে লেগে থাকে। কিন্তু সিঙ্গুলারিটিতে কীভাবে থাকে? তার তো কোনো আয়তনই নেই। আয়তনশূন্য একটা স্থানে কমপক্ষে তিনটি সূর্যের ভরের সমান বস্তু কীভাবে থাকে?
এটাই হলো সিঙ্গুলারিটির রহস্য। এ রহস্যের সমাধান বিজ্ঞানীরা আজও করতে পারেননি।
এই লেখাটি লেখকের কৃ্ষ্ণগহ্বর নামের বইটির অংশবিশেষ।
ধন্যবাদ।